“প্রতিবাদের বুলিও নাকি তারা শেখাবেন”ভাবনায় সোনালী

“প্রতিবাদের বুলিও নাকি তারা শেখাবেন”ভাবনায় সোনালী

গতকাল দুজন প্রতিবেশী হঠাৎ করেই আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যেবেলায় একটা বিশেষ কাজে এসেছিলেন। আমার ক্লাস নাইনে পড়া ছেলেটা তখন ক্যানভাসে চার পাঁচ রকমের রং ছড়িয়ে আঁকছিল সূর্যোদয়ের ছবি, নতুন ভোরের আলো প্রকৃতির বুকে কিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তার ছবি। ভদ্রলোক দুজন তখন হঠাৎই ক্যানভাসের ছবিটিকে লক্ষ্য করে খুব অসহিষ্ণু ভাবে, মশকরা আর বিদ্রুপের ছলে আমার উপস্থিতিতেই আমার ছেলেটিকে কয়েকটি কথা বললেন “একি!! তুমি চারপাশের কোন খবর রাখো না? বর্তমানের পরিস্থিতি যে কতটা বিষাক্ত,ভয়ংকর, তুমি তা জানো না?? যে তুমি এই পরিস্থিতিতে এই সব কিছু ছেড়ে এখন সূর্যোদয়,রামধনু আর ফুল ফল সজ্জিত প্রকৃতির ছবি আঁকছো! কিছু মনে করো না হ্যাঁ তোমাকে একটা কথা বলি,আমার মেয়ে সেও কিন্তু প্রায় তোমারই বয়সী হবে অথচ সে এইসব ব্যাপারে খুবই সচেতন। কোথায় কখন কি আন্দোলন হচ্ছে,মিছিল মিটিং হচ্ছে,কোন নিউজ চ্যানেল কখন কোন অরাজকতার চিত্র বা সত্য তুলে ধরছে সে এই সবকিছু সম্পর্কে খুবই সচেতন। আর সেই কারণেই ও মরে গেলেও এই সব পরিস্থিতিতে ফুল, ফল,পাতা,প্রেম ভালবাসা এসব নিয়ে ছবি আঁকবে না। এইতো গতকালের ই ঘটনা ধরো না গণ-আন্দোলন নিয়ে এমন একটা অসাধারন ছবি এঁকেছে যে তার মধ্যে দিয়ে এমন একটা বলিষ্ঠ সামাজিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে সবাইকে যে সবার কাছে উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। এই না হলে আর আজকালকার দিনের ছেলে মেয়ে!!”

প্রথম ভদ্রলোকের কথা শেষ হতে না হতেই দ্বিতীয় ভদ্রলোকটি বলে উঠলেন ” ঠিকই বলেছেন। এখন যা পরিস্থিতি! এই পরিস্থিতিতে হালকা চালের আর কোনো কিছুই নেওয়া যায় না মানে ভালো লাগেনা, বিরক্তিকর লাগে। এই ধরুন না আমার ছেলে সেও তো প্রায় এরই সমবয়সী হবে,সম্প্রতি ধর্ষণ আর ধর্ষক নিয়ে ইংরেজিতে যা একটা ছোট গল্প লিখেছে না যে কি বলবো, চারপাশে একেবারে হইহই শুরু হয়ে গেছে।”
ওদের মুখে এই সব কথা শুনে আমি কিছু মুহূর্তের জন্য চুপ করে ছিলাম। আসলে অপাত্রে যে ঠিক কি বলবো আর কতটা বলবো সেটাই ভেবে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ করেই আমার স্বল্পভাষী ছেলেটা ভদ্রলোক দুজনকে এর উত্তর দিয়ে বসলো অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে।
ও বলল “আপনাদের মনে হচ্ছে যে এই পরিস্থিতিতে আমি কেন এমন ছবি আঁকছি! যেখানে সমাজের বুকে এখন শুধুই আর্তনাদ,অত্যাচার,ব্যভিচার আর প্রতিবাদের ঝড়। কিন্তু এত কিছুর পরেও কোথাও কি কোন ভালোবাসা বা বিশ্বাস নেই?? এখন কি সত্যি সত্যিই সূর্যোদয় আর হয় না সূর্যাস্তের পর? বিশ্বাসঘাতকদের মাঝখানে দু একটি হলেও কি ভালো মানুষ এখন আর অবশিষ্ট নেই?? ধ্বংসের পরে এখনো কি আমরা সৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর গুনি না? রাতের অবসানে দিনের প্রতীক্ষা করি না? তাহলে আমি কেন এই বিষয়ের ছবি আঁকতে পারবো না?? তা কেন কোন পরিস্থিতিতেই অপ্রাসঙ্গিক হবে?প্রতিবাদ বা আন্দোলনের ছবি,এই পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক হলে,প্রেম ভালোবাসা,ফুল ফল নিয়ে লেখা গান বা কবিতাও প্রাসঙ্গিক হবে। কারণ এটাই তো সেই আলো বা রসদ যা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমাদেরকে বাঁচতে শেখাবে, লড়তে শেখাবে,কোন কিছুর সাথে আপোষ না করে এগিয়ে যেতে শেখাবে।নেগেটিভিটির মাঝখানে আরো নেগেটিভিটি না ছড়িয়ে যদি সামান্যতম পজিটিভিটি ছড়িয়ে দি তাহলে ক্ষতি কি??
ওর মুখে এই ধরনের উত্তর শুনে আমি সত্যিই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। তা সে ও আমার নিজের সন্তান বলে নয়,ওর মন মানসিকতার উদারতা এবং পজিটিভিটি দেখে। ও কখনোই খুব একটা বেশি কথা বলে না অথচ এই ব্যাপারে এইভাবে এতটা পরিশিলিত,মার্জিত ও যুক্তি সম্মত কথাবার্তা বলছে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম।

আসলে কিছুদিন আগেও এই ভদ্রলোক দুজন অন্য একটি কারণে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন আর তখনো ওনারা দুজনে আমার ছেলেকে আমার সম্পর্কে খোঁচা দিয়ে দুই একটি কথা বলেছিলেন যা আমার ছেলের একেবারেই ভালো লাগেনি। সেদিন উত্তরটা যদিও আমিই দিয়েছিলাম তা সত্বেও হয়তো অবচেতন মনে এনাদের এই ধরনের অভদ্র কথাবার্তা একটা বিরূপ ছাপ ফেলেছিল ওর মনে। আর হয়তো সেই কারণেই ও এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় এইভাবে প্রতিবাদ করেছে।

ওনারা সেদিন বলেছিলেন,” এরকম পরিস্থিতিতেও তোমার মা প্রেম-ভালোবাসা আর ফুল ফল নিয়ে কবিতা লেখেন! বর্তমান পরিস্থিতিতে তা তো একেবারেই বেমানান। উনি বোধহয় লেখার মধ্য দিয়ে বা অন্য কোন ভাবে প্রতিবাদ করতে ভয় পান,পাছে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হয় সেই ভেবে….!!!”

ওনাদের এইসব কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে সেদিন আমিই এর উত্তরটা দিয়েছিলাম।বলেছিলাম-” হ্যাঁ আপনারা একদম ঠিকই ধরেছেন। আমি প্রতিবাদের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করতে সত্যিই ভয় পাই, আমার সে কথা স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র লজ্জা বা সংকোচ নেই। তা সে ঘোষিত বা অঘোষিত যে ধরনের ব্যক্তিত্বের ফলশ্রুতি বলেই মনে করুন না কেন। ভয় আমি পাই তার কারণ,প্রায় বছর হতে চলল এখনো আমাদের সমাজের বুকে ঘটা বহু নৃশংস ঘটনার কোনো যথাযথ প্রতিবিধান হয়নি আমাদের বিচার ব্যবস্থার দৌলতে। আর তাই এই ধরনের ভ্রষ্টাচারে জর্জরিত সমাজে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করলে যে তার পরিণতিও ভয়াবহ হতে পারে সে বিষয় টা আমাকে ভাবায়। আর এই ক্ষেত্রে যে স্বনামধন্য লেখিকা তসলিমা নাসরিন ও বাদ যান না সে আমি জানি। তাই আমার মত কিছুটা স্বঘোষিত গোছের মানুষ 😂 স্বাভাবিকভাবেই যে আপনাদের সাহায্যের হাত পাব না, তাও আমার জানা আর এই কারণেই এই সবকিছুর ফলশ্রুতি হিসেবে আমি আমার ফুটফুটে নাবালক ছেলেটি কে অনাথ হতে দিতে পারি না। আর আপনারা তো বোধ হয় তখনও নির্বিচারে মানুষের চারিত্রিক পোস্টস্মর্টেম করাতেই ব্যস্ত থাকবেন। তখনও এতোটুকুও কমবে না মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়ার কারসাজি।

“নেত্রী হওয়ার লোভে নিজের সন্তানটাকেও পর্যন্ত বলি দিয়ে দিল কি ধরনের মেয়ে মানুষ বোঝো একবার!!”কি ঠিক বলছি তো??”
………………………
এইসব কথা সেদিনই আমার ছেলের মনে ওদের বিরুদ্ধে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। হয়তো সেই কারণেই ওনাদের ওই একই ধরনের মন মানসিকতার পুনরাবৃত্তি দেখে ও আর চুপ করে থাকতে পারেনি।

কি অদ্ভুত না!!যখনই আমাদের চারপাশে কোনো না কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে একটা অশান্ত,উত্তাল পরিবেশ তৈরি হয়,তখনই কিছু মানুষ অন্যের তুলনায় নিজেরা কতটা বেশি প্রতিবাদী বা সমাজ সচেতন সেই বিষয়টাকে প্রতিপন্ন করার জন্য একেবারে গলায় ঢাক ঝুলিয়ে অন্যের সমালোচনা করতে বেরিয়ে পড়েন। কিভাবে তুচ্ছ কোনো বিষয়কে হাইলাইট করে কোমর বেঁধে খামোখা ছায়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন তারই পরিকল্পনা করতে থাকেন। প্রতিবাদের ছুঁতো করে অহেতুক কিছু মানুষকে টেনে হিঁচড়ে নামানোই এর একমাত্র উদ্দেশ্য।

তারা ভুলে যান যে, প্রতিটা মানুষের একটা ব্যক্তিগত জীবনও আছে। সেখানেও তাদের নানান রকমের লড়াই, সংগ্রাম, দায়-দায়িত্ব পাওয়া না পাওয়ার টানাপোড়েন থাকে। তাই যদি এই সব কিছু মিলিয়ে কোন মানুষ মিছিল মিটিং বা প্রতিবাদের বাতাবরণে “জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা” বা “কারার ওই লৌহ কপাট” গানগুলোর সাথে সাথে,প্রেম ভালোবাসার গান ও করেন,কবিতা লেখেন বা ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ক্যানভাসে অরাজক পরিবেশের সাথে সাথে প্রকৃতি,ফুল ফল,গাছ নিয়ে ছবি আঁকে তাহলে ক্ষতি কি ?? আর তাছাড়া ওনাদের জ্বালা ধরা মন্তব্য গুলো শুনে তো বোঝাই যাচ্ছে যে এইসব প্রেম ভালোবাসা ফুল ফল নিয়ে কবিতা বা গান লেখা বা গাওয়া মানুষগুলো ঠিক ওনাদের স্তরের বা ক্লাসের পন্ডিত নন। তাহলে এই সব নিম্নমানের হাস্যকর বিষয় নিয়ে কবিতা লেখা, গান বাধা দু একজন মানুষের পক্ষে নিশ্চয়ই এই জ্বালা মুখী আন্দোলনের অভিমুখ কে প্রভাবিত করাও সম্ভব নয়।

তাই সর্বান্তকরণে কামনা করি যেন মানভূম, সিংভূম,বীরভূম বা অন্যান্য যে কোনো ভূমি বা ভূম থেকে খুব শিগগির আবার ও কয়েকজন বিনয়,বাদল,দীনেশ বা মাতঙ্গিনী হাজরা,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মত স্বাধীনতা সংগ্রামী মানুষেরা বেরিয়ে আসেন যারা তাদের অভাবনীয় ব্যক্তিত্বের জোরে আর নেতৃত্বের জোরে বহু সাধারণ মানের স্বঘোষিত গায়ক গায়িকা,নায়ক নায়িকা,লেখক লেখিকাদের সর্বজন দ্বারা স্বীকৃত বা ঘোষিত নোবেল,পদ্মশ্রী,পদ্মভূষণ,অস্কার বিজয়ী মহান মানুষদের সাথে যুক্ত করে,এই গণআন্দোলন কে সাফল্যমন্ডিত করে তুলতে পারেন।

 

 

 

administrator

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *